বিভাজন কি আমাদের ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে? মদিনার ইতিহাস ও আজকের বাংলাদেশ!

Zero Medic 07 Apr 2026
বিভাজন কি আমাদের ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে? মদিনার ইতিহাস ও আজকের বাংলাদেশ!

আল্লাহ আমাদের সতর্ক করেছেন যে, বিভাজন আমাদের কেবল অন্ধকারের দিকেই নিয়ে যাবে। আসুন, আমরা কোনো চক্রান্তকারীর কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে নিজেদের অর্জিত সাফল্য আর ভ্রাতৃত্বকে রক্ষা করি। নতুবা ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

ইতিহাসের এক পুনরাবৃত্তি
প্রাচীন মদিনায় (তখনকার ইয়াসরিব) দুটি বড় গোত্র ছিল— আউস এবং খাজরাজ। তাদের মধ্যে দীর্ঘ ১২০ বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলেছিল। কিন্তু ইসলামের সুশীতল ছায়ায় এসে তারা সব শত্রুতা ভুলে একে অপরের প্রাণের ভাই হয়ে গেলেন। এই অভূতপূর্ব ঐক্য দেখে হিংসায় জ্বলে উঠলেন শাম্মাস ইবনে কায়েস নামে এক কুচক্রী বৃদ্ধ। তিনি চাইলেন এই ঐক্য ভেঙে দিতে।

তিনি এক সমাবেশে গিয়ে তাদের পুরনো যুদ্ধের বীরত্বগাথা ও কবিতা শুনিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে তোলা। কাজও হলো তাই; মুহূর্তের মধ্যেই ভ্রাতৃত্বের জায়গা নিল আক্রোশ। দুই পক্ষ তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সেখানে উপস্থিত হয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
> "আমি তোমাদের মাঝে থাকতেও তোমরা জাহেলিয়াতের দিকে ফিরে যাচ্ছ?"
>
তৎক্ষণাৎ তাদের হুঁশ ফিরল। তারা বুঝতে পারলেন এটি ছিল একটি শয়তানি চক্রান্ত। তারা অস্ত্র ফেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। এই প্রেক্ষাপটেই নাজিল হলো পবিত্র কোরআনের সেই সতর্কবাণী:
> "হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোনো দলের কথা মানো, তবে তারা তোমাদের ঈমান আনার পর পুনরায় কাফেরে (অন্ধকার যুগে) পরিণত করে ছাড়বে।" (সূরা আল-ইমরান: ১০০)
>
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট: আধুনিক 'শাম্মাস' ও আমাদের বিভাজন
মদিনার সেই ঘটনার সাথে আজকের বাংলাদেশের পরিস্থিতির এক অদ্ভুত ও ভয়াবহ মিল লক্ষ্য করা যায়। আমাদের দেশেও যখনই কোনো বড় অর্জনের মাধ্যমে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়, তখনই কোনো না কোনো পক্ষ সেই ঐক্যের সুতা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
১. জাতীয় অর্জন বনাম বিভাজনের রাজনীতি
আমাদের মহান 'মুক্তিযুদ্ধ' কিংবা চব্বিশের 'জুলাই বিপ্লব'—এগুলো ছিল জাতির শ্রেষ্ঠ ঐক্যের মুহূর্ত। কিন্তু আজ আমরা কী দেখছি? মদিনার সেই বৃদ্ধের মতো একদল মানুষ সারাক্ষণ পুরনো রাজনৈতিক ক্ষত খুঁচিয়ে দিচ্ছে। কেউ 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'র দোহাই দিয়ে অর্ধেক মানুষকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, আবার কেউ নতুন পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে অন্যকে আক্রমণ করছে। এই 'ট্যাগিং' বা তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি মূলত আমাদের সেই ভ্রাতৃত্বকেই ধ্বংস করছে যা আমরা রাজপথে বুকের রক্ত দিয়ে অর্জন করেছিলাম।
২. সোশ্যাল মিডিয়া: বিষ ছড়ানোর আধুনিক অস্ত্র
শাম্মাস ইবনে কায়েস সেদিন কবিতা ব্যবহার করেছিলেন, আর আজকের দিনে আমাদের হাতে আছে স্মার্টফোন। ফেসবুক আর ইউটিউবে এমন সব বয়ান বা কন্টেন্ট ছড়ানো হয় যা মুহূর্তের মধ্যে ভাইয়ে-ভাইয়ে বিভেদ সৃষ্টি করে। আমরা যাচাই না করেই একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করি। মনে রাখবেন, যারা আপনাকে ঘৃণা করতে শেখায়, তারা কখনোই আপনার বা দেশের বন্ধু হতে পারে না।
৩. শত্রু যখন আমাদের অনৈক্যে হাসে
মদিনার সেই চক্রান্তকারী চেয়েছিলেন মুসলমানরা নিজেরা মারামারি করে ধ্বংস হয়ে যাক। আজ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই। আমরা যখন 'বাম-ডান', 'সেকুলার-ইসলামিস্ট' কিংবা 'মুক্তিযুদ্ধ-জুলাই' দ্বন্দ্বে লিপ্ত হই, তখন তৃতীয় কোনো পক্ষ বা বহিঃশত্রু আড়ালে বসে হাসে। আমাদের এই বিভাজন দেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
পরিত্রাণের পথ:
আমাদের করণীয় কী?
কোরআনের সেই নির্দেশ আর রাসূল (ﷺ)-এর সেই পদক্ষেপ আজও আমাদের জন্য মুক্তির পথ:
* প্ররোচনা চিনতে শিখুন: কেউ যখন পুরনো কোনো ইস্যু তুলে আপনার মধ্যে ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করবে, বুঝবেন সে মদিনার সেই শাম্মাস ইবনে কায়েসের উত্তরসূরি। তার কথায় প্রলুব্ধ হওয়া মানেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনা।
* ব্যক্তির চেয়ে দেশ বড়: রাজনৈতিক দল বা আদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের প্রয়োজনে আমাদের একক পরিচয় হওয়া উচিত 'বাংলাদেশি'।
* ট্যাগিং কালচার বন্ধ করা: সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে 'ফ্যাসিস্ট', 'রাজাকার' বা 'দেশদ্রোহী' বলা বন্ধ করতে হবে। মনে রাখবেন, বিভাজন মানুষের বিচারবুদ্ধি কেড়ে নেয়।
* ঐক্যের তওবা: আউস ও খাজরাজ যেমন ভুল বুঝতে পেরে কোলাকুলি করে কেঁদেছিলেন, আমাদেরও সময় এসেছে সব বিভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থে এক হওয়ার।

মদিনার সেই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের শেখায় যে, ঘৃণা ছড়ানো খুব সহজ, কিন্তু ঐক্য ধরে রাখা কঠিন। আল্লাহ আমাদের সতর্ক করেছেন যে, বিভাজন আমাদের কেবল অন্ধকারের দিকেই নিয়ে যাবে। আসুন, আমরা কোনো চক্রান্তকারীর কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে নিজেদের অর্জিত সাফল্য আর ভ্রাতৃত্বকে রক্ষা করি। নতুবা ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।