আমি একজন নিউরোসার্জন হিসেবে প্রতিদিন চেম্বারে অসংখ্য রোগী দেখি যারা দীর্ঘদিনের পিঠ বা কোমর ব্যথায় (Back Pain) ভুগছেন।
খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন প্রায়ই শুনি— "ডাক্তারবাবু, আমার তো শুধু কোমর ব্যথা, আপনি ওজন কমাতে বলছেন কেন?"
আজ একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খুব সহজ ভাষায় আপনাদের বুঝিয়ে বলব, কেন আপনার শরীরের বাড়তি ওজন আপনার মেরুদণ্ডের সবচেয়ে বড় শত্রু।
ওজন এবং কোমর ব্যথা: শরীরের "অতিরিক্ত বোঝা"
আমাদের মেরুদণ্ড অনেকটা একটি দালানের মূল পিলারের মতো, যা পুরো শরীরের ভার বহন করে। আপনি যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ওজনের হন, তখন আপনার মেরুদণ্ড এবং এর চারপাশের মাংসপেশির ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ে।
১. মেরুদণ্ডের বাঁক পরিবর্তন
পেটে অতিরিক্ত চর্বি থাকলে শরীরের ভারকেন্দ্র (Center of Gravity) সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। এর ফলে নিচের দিকের মেরুদণ্ড সামনের দিকে বেশি বেঁকে যায়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় লাম্বার লর্ডোসিস নামে পরিচিত। এটি কোমরের স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।
২. ডিস্কের সমস্যা (Slipped Disc)
মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর মাঝে জেলের মতো নরম এক ধরণের কুশন থাকে, যাকে আমরা **ডিস্ক** বলি। শরীরের অতিরিক্ত ভারের কারণে এই ডিস্কগুলো পিষ্ট হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে (Herniated Disc), যা স্নায়ুর ওপর চাপ দিয়ে অসহ্য যন্ত্রণার সৃষ্টি করে।
৩. অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা হাড়ের ক্ষয়
বেশি ওজনের কারণে মেরুদণ্ডের জয়েন্টগুলো দ্রুত ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। ফলে হাড়ের ঘর্ষণে প্রদাহ তৈরি হয় এবং চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিউরোসার্জন হিসেবে আমি শুধু অপারেশন করি না, অপারেশন যাতে না লাগে সেই পথও দেখাই। কোমর ব্যথা কমাতে চাইলে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:
আপনার উচ্চতা অনুযায়ী সঠিক ওজন (BMI) বজায় রাখুন। মাত্র ৫ কেজি ওজন কমালেও আপনার মেরুদণ্ডের ওপর থেকে অনেকটা চাপ কমে যাবে।
পেটের এবং পিঠের মাংসপেশি শক্ত করার ব্যায়াম করুন। এতে মেরুদণ্ড বাড়তি সাপোর্ট পায়।
দীর্ঘক্ষণ কুঁজো হয়ে বসে থাকবেন না। সোজা হয়ে বসার অভ্যাস করুন।
হাড় মজবুত রাখতে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার খান।
যদি ব্যথা পায়ের দিকে নেমে যায়, পা অবশ লাগে বা প্রস্রাব-পায়খানায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, তবে দেরি না করে দ্রুত একজন নিউরোসার্জনের পরামর্শ নিন।
সুস্থ থাকুন, মেরুদণ্ডের যত্ন নিন। মনে রাখবেন, আপনার ওজন যত কম হবে, আপনার মেরুদণ্ড তত বেশি দিন আপনার ভার বইতে পারবে